বিশ্বব্যাংকের সতর্কবার্তা

বাণিজ্যযুদ্ধে ক্ষতির মুখোমুখি দুই-তৃতীয়াংশ উন্নয়নশীল দেশ

চলমান বৈশ্বিক বাণিজ্যযুদ্ধের প্রভাবে চলতি বছর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি হতে পারে প্রত্যাশার তুলনায় কম।

চলমান বৈশ্বিক বাণিজ্যযুদ্ধের প্রভাবে চলতি বছর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি হতে পারে প্রত্যাশার তুলনায় কম। একই সঙ্গে মার্কিন শুল্কনীতির এ অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক অর্থনীতি ষাটের দশকের পর সবচেয়ে ধীরগতির দশকের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এসব পূর্বাভাস তুলে ধরে বিশ্বব্যাংক সতর্ক করে বলেছে, বিশ্বায়ন একসময় অনেক দেশের জন্য ‘অর্থনৈতিক বিস্ময়’ নিয়ে এসেছিল। কিন্তু সে প্রক্রিয়া এখন উল্টো পথে চলছে। খবর এফটি।

আন্তর্জাতিক সংস্থাটির সর্বশেষ অর্থনৈতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলো ২০২৫ সালে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে, যা গত বছরের ৪ দশমিক ২ শতাংশ থেকে কম এবং ২০১০-এর দশকের গড় হারের চেয়ে ১ শতাংশেরও বেশি নিচে।

চলতি বছরে উন্নয়নশীল দেশগুলোয় মাথাপিছু আয় প্রবৃদ্ধি হবে ২ দশমিক ৯ শতাংশ, যা ২০১৯ সাল পর্যন্ত দুই দশকের গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আর্থিক সংকটের বছরগুলো বাদ দিলে ২০২৫ সাল হবে ২০০৮ সালের পর সবচেয়ে মন্থর বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির বছর।

প্রতিবেদনে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, গত কয়েক দশকে বিশ্বায়নের সুফল সবচেয়ে বেশি পেয়েছে, এমন দেশগুলোর বাণিজ্যের ওপর আঘাত এনেছে চলমান শুল্কযুদ্ধ। এর প্রভাবে পণ্য ও সেবা খাতে বৈশ্বিক বাণিজ্য প্রবৃদ্ধি ২০২৫ সালে ১ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে আসবে, পূর্বাভাস সংশোধনের আগে যা ছিল ৩ দশমিক ৪।

বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও কমিয়ে এনেছে বিশ্বব্যাংক। ২০২৫ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি হবে ২ দশমিক ৩ শতাংশ, যা জানুয়ারির পূর্বাভাসের তুলনায় দশমিক ৪ শতাংশ কম।

বিশ্বব্যাংক এর আগের পূর্বাভাসটি প্রকাশ করেছিল গত জানুয়ারিতে। ডোনাল্ড ট্রাম্প তখনো দায়িত্ব নেননি। এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জাপান, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত অনেক দেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ বছরের দ্বিতীয়ার্ধে বিশ্ব বাণিজ্য কার্যত থেমে যেতে পারে, যার সঙ্গে ব্যাপক আস্থা সংকট, অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি এবং আর্থিক বাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।

বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, গত অর্ধশতকে উন্নয়নশীল দেশগুলোয় মাথাপিছু জিডিপি প্রায় চার গুণ হয়েছে এবং ১০০ কোটিরও বেশি মানুষ চরম দারিদ্র্য থেকে বের হয়ে এসেছে। কিন্তু অর্থনৈতিক রূপান্তরের সে ধারা এখন হুমকির মুখে। কারণ উন্নয়নশীল দেশগুলো বাণিজ্য সংঘাতের সম্মুখ ভাগে দাঁড়িয়ে আছে।

বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ইন্দরমিত গিল সতর্ক করে বলেন, ‘এশিয়ার বাইরে উন্নয়নশীল বিশ্ব যেন এখন এক উন্নয়নহীন অঞ্চল হয়ে উঠছে।’

তিনি আরো জানান, তিন দশক ধরে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি ক্রমান্বয়ে কমছে। ২০০০-এর দশকে বার্ষিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও পরের দশকে তা ৫ শতাংশ নেমে আসে। চলতি ২০২০-এর দশকে এটি ৪ শতাংশের নিচে রয়েছে।

উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই), যা কিনা ২০০৮ সালের শীর্ষ পর্যায়ের তুলনায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে, বর্তমান পরিস্থিতির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হলো বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা বৃদ্ধি, নীতিগত অনিশ্চয়তা স্থায়ী হয়ে ওঠা এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি।

ধনী দেশগুলোয় মাথাপিছু জিডিপি কভিড-১৯ মহামারীর আগের প্রত্যাশিত অবস্থানে পৌঁছে গেছে, কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলো ৬ শতাংশ পিছিয়ে আছে। চীন বাদ দিলে এ দেশগুলোকে ২০২০-এর দশকের অর্থনৈতিক ক্ষতি পুষিয়ে তুলতে প্রায় দুই দশক সময় লাগবে।

উন্নয়নশীল দেশের সামনে বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যেমন স্থিতিশীল ও স্বচ্ছ বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিবেশ পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং সংঘাত, ঋণের বোঝা ও জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে লড়াই। এক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য সহায়তা প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক।

মার্কিন অর্থনীতির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল উদীয়মান বাজার মেক্সিকো। গত মাসে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি বছরের জন্য প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নামিয়ে এনেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার রিজার্ভ ব্যাংকও সম্প্রতি সতর্ক করে বলছে, আফ্রিকা মহাদেশের সবচেয়ে শিল্পোন্নত এ অর্থনীতির জন্য দেয়া ১ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস এখন ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ফার্স্ট ম্যানেজিং ডিরেক্টর গীতা গোপীনাথ গত মাসে বলেছিলেন, উদীয়মান অর্থনীতিগুলো কভিড-১৯ সংকটকালের তুলনায় কঠিন নীতিগত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। কারণ শুল্কের প্রভাব আগে অনুমান করা কঠিন এবং পুঁজির নেতিবাচক প্রবাহের ঝুঁকি রয়েছে।

অবশ্য বিনিয়োগকারীরা এখন বড় উদীয়মান বাজার থেকেই বেশি লাভবান হচ্ছেন। এর পেছনে রয়েছে মার্কিন ডলারের দুর্বলতা এবং উচ্চ শুল্ক বাতিল হয়ে যাবে এমন প্রত্যাশা। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ডলারের বিপরীতে ব্রাজিলিয়ান রিয়াল ১১ শতাংশ শক্তিশালী হয়েছে, যা সুইস ফ্রাঁ বা ইউরোর চেয়েও বেশি। মেক্সিকান পেসো ও তাইওয়ান ডলার দুটিই প্রায় ১০ শতাংশ শক্তিশালী হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় কারেন্সি বন্ড ও উদীয়মান বাজারের শেয়ার প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে, যা ইউরোপীয় স্টকের পর বিশ্বজুড়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পারফর্মিং সম্পদ।

বছরের শুরুতে অনেক বিনিয়োগকারী ধারণা করেছিলেন, মার্কিন শুল্কের কারণে উদীয়মান এশীয় অর্থনীতিগুলো বড় ধাক্কা খাবে। কিন্তু বাস্তবে এ অঞ্চলের মুদ্রার মান ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। এসব দেশ গত কয়েক বছর মার্কিন শেয়ার ও বন্ডে ব্যাপকভাবে বিনিয়োগ করেছিল, কিন্তু এখন তারা ডলারভিত্তিক সম্পদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।

আরও